টানা তিন বছর দুই অংকের রিটার্নের পর ২০২৬ সালে একই ধারা অব্যাহত রাখা মার্কিন শেয়ারবাজারের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আরেকটি শক্তিশালী বছর পেতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার-সংক্রান্ত নীতিগত অবস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা ও করপোরেট ধারাবাহিক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। খবর রয়টার্স।
২০২২ সালের অক্টোবর থেকে বিদ্যমান বাজারের বুলিশ প্রবণতা মূলত এআই-সংক্রান্ত আশাবাদ, সুদহার কমা ও অর্থনীতির স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এগিয়েছে। এ সময় শেয়ারবাজারে কিছু অস্থিরতাও দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শুল্ক ঘোষণার পর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন ঘটে। তবে বছরের শেষ ভাগে বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। এখন পর্যন্ত ২০২৫ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। এর আগে ২০২৪ সালে সূচকটির প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ২৪ শতাংশ।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ২০২৬ সালে আবার ডাবল ডিজিট রিটার্ন পেতে হলে সবকিছু একসঙ্গে অনুকূল অবস্থায় চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ফাইন্যান্সিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (সিএফআরএ) প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ স্যাম স্টোভাল বলেন, ‘আগামী বছরের জন্য অনেক প্রতিকূলতা এখনো রয়ে গেছে। বছরটি ভালো হতে পারে, তবে এটি আবার একটি অসাধারণ বছর হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ২০২৬ সালের শেষে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক পৌঁছতে পারে ৭ হাজার ৪০০ পয়েন্টে, যা বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।’
অন্যদিকে কিছু বিনিয়োগ ব্যাংক তুলনামূলক বেশ আশাবাদ দেখিয়েছে। ডয়চে ব্যাংক ২০২৬ সালের জন্য এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর লক্ষ্য ধরেছে ৮ হাজার পয়েন্ট। এটি বর্তমান স্তরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালে মার্কিন শেয়ারবাজার ভালো করতে পারে, এমন পূর্বাভাসকে বাস্তব রূপ দিতে পারে করপোরেট মুনাফায় শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। বাজার তথ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলএসইজির আয় গবেষণা বিভাগের প্রধান তাজিন্দর ধিলন বলেন, ‘২০২৬ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়তে পারে ১৫ শতাংশের বেশি। ২০২৫ সালে এ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। মুনাফায় এ বৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আর্থিক প্রণোদনা ও সহজ মুদ্রানীতির প্রভাবে অর্থনীতি ও ভোক্তা ব্যয় সমর্থন পেতে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতের বাইরের কোম্পানিগুলোরও মুনাফা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত কয়েক বছর মার্কিন শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত সাতটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি। কোম্পানিগুলো হলো এনভিডিয়া, অ্যাপল, অ্যালফাবেট, মেটা, মাইক্রোসফট, টেসলা ও অ্যামাজন। ২০২৪ সালে এ সাত কোম্পানির সম্মিলিত মুনাফা বেড়েছিল ৩৭ শতাংশ। একই সময় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের বাকি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এ ব্যবধান কমে আসতে পারে। বছরটিতে ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেনের মুনাফা প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে সূচকটির আওতাভুক্ত বাকি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রবৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ১৩ শতাংশ।
এআই খাতে বিনিয়োগ এখন মার্কিন শেয়ারবাজারের একটি বড় চালিকা শক্তি। অবকাঠামো তৈরি ও এআই-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশনের চাহিদা বাড়বে, এমন প্রত্যাশায় অনেক কোম্পানি এ বাবদ বড় অংকের মূলধনী ব্যয় করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠছে, এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন আদৌ পাওয়া যাবে কিনা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান ইকুইটি কৌশলবিদ জেফ বুকবিন্ডার সতর্ক করে বলেন, ‘যদি কোম্পানিগুলো এআই-সংক্রান্ত ব্যয় কমাতে শুরু করে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়, তাহলে ২০২৬ সালে মার্কিন শেয়ারবাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে বা সামান্য নিম্নমুখী হতে পারে।’
২০২৬ সালে মার্কিন শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিকে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমনভাবে ধীর হতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ফেড সুদহার কমানোর সুযোগ পায়। তবে প্রবৃদ্ধি খুব বেশি কমে গেলে দেশটির অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকিও রয়েছে।
ফেড ফান্ডস ফিউচার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা ২০২৬ সালে অন্তত দুই দফায় ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমার প্রত্যাশা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিএনসি ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস গ্রুপের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ ইয়াং ইউ মা বলেন, ‘মার্কিন শেয়ারবাজারের জন্য সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হবে ফেডের সহনশীল নীতি অবস্থান বজায় রাখা।’
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের পর যেসব বুল মার্কেট চতুর্থ বছরে পৌঁছেছে, সেগুলোর গড় রিটার্ন ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন বছরগুলোয় গড় রিটার্ন ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।